১৮ই ফেব্রুয়ারি ২০২২। শীতের কোন এক শুক্রবার। হালকা রোদ আর হালকা শীতের সম্মিলিত ভাবোদয় করা এই দিনে গায়ে দোল খাচ্ছিল মৃদু মৃদু বাতাস। এক কথায় বলতে গেলে দিনটি ছিল অসাধারণ। হালকা নাস্তা করে রেডি হতে না হতেই বাহির থেকে আসে পিপ পিপ শব্দ। লকডাউনের এই উঁচু দেওয়াল টপকে রওনা দিলাম নিমতলি সমুদ্র সৈকতের উদ্দেশ্যে।
নিমতলী হলো হাতিয়ায় (নোয়াখালী জেলার একটি থানা) অবস্থিত এক অপরূপ সৌন্দর্যময়ী সমুদ্র সৈকত, যা এখানকার একটি অন্যতম পর্যটন কেন্দ্র। যার বিশাল বালুচর, সমুদ্রের ঢেউ-তীর ও প্রাকৃতিক রূপচিত্র আবেগে উপড়ে দিতে পারে যে কারো মন কে। নিজের মাতৃভূমির এই অলংকারের কথা লোকমুখে কত শুনেছি। আজ সৌভাগ্য হলো এই অপরূপ মহিমায় কিছুটা সময় কাটানোর। আমরা ছিলাম মোট ৯ জন। আব্বু-আম্মু,আমরা তিন ভাই-বোন (আদিব,তায়েবা,লাবিব), ভাবি ও উনার তিন ছেলে মেয়ে (লোপা,নাদিব, জামিলা)। নাদিব যেমন একদিকে আমার ভাইফো তেমন অন্যদিকে আমার ক্লাসমেট।
জাতীয় উদ্যান হাতিয়ার মূল শহর ওছখালী থেকে নিমতলীর দূরত্ব হচ্ছে ১৮.১ কিলোমিটার। দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়ার পর দেখি দুটো গাছের সাথে টাঙ্গানো একটি পোস্টারে লেখা “স্বাগতম দিন নীমতলি সমুদ্র সৈকতে।” বুঝতে বাকি রইলো না আমরা প্রায় চলে এসেছি। রাস্তার ডান পাশে দেখি বিশাল একটি মাঠে এক দলবেঁধে একদল গরু-মহিষ ঘাস খাচ্ছে। কালো রঙের এক ছাগল ছানা ম্যা ম্যা করে কোথাও একটা ছুটছিল। কি অপরূপ দৃশ্য! পরপরই নজরে কড়া নাড়লো বেড়া দেওয়া একটি ফুটবল মাঠ। এটি মোহাম্মদ আলী স্টেডিয়াম। শুনেছিলাম এখানকার একটি বড় আকর্ষণ এটি। দুপুর তিনটা থেকে এখানে খেলা শুরু হয়; আর সেই খেলা দেখার জন্য দূর-দূরান্ত থেকে আসে অনেক মানুষ। যাইহোক, নীমতলীর মূল স্পটে ছিল (কাপড়ে ভেড়া দেওয়া) অনেকগুলো দোকানপাট, চরকা আরো কত কি! আমরা এখানে না নেমে সরাসরি সমুদ্র তীরে এসে নামি।
সম্ভবত তখন সাড়ে দশটা। চারদিকে দেখি পর্যটকদের ভিড়। তাদের মধ্যে অধিকাংশই ব্যস্ত ছবি তোলাতে। আর দুজন লোককে দেখলাম স্লিপিং চেয়ারে শুয়ে মোবাইল ফোনে এর চেয়ে ও ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছে। বিশাল বিস্তৃতি তীরে নজরে এল একদল লাল ক্যাকডা যারা স্থিরচিত্রে রোদ পোহাচ্ছে। লোকসকলের ভয়ে বারবারই এরা ছোট গর্তের মাঝে লুকিয়ে পড়ে।
উপস্থিত সকলের মত আমরাও ছবি তোলাতে মগ্ন হয়ে পড়ি। ক্যামেরাম্যান হিসেবে ছিলাম আমি আর নাদিব। আসলে এখানকার চারদিকের পরিবেশ ছিল অসাধারণ। ছোট ছোট ঢেউ আর মিষ্টি বাতাস ছিল মন ভোলানোর মতো। পারিবারিক কিছু ছবি তুলে আমরা নির্দিষ্ট সীমার মাঝে ঘুরতে থাকি।
আমরা ছোটরা কিছুক্ষণ বালির মধ্যে নিজেদের নাম খোদাই করছিলাম। মজার ব্যাপার হলো যতবার আমরা নাম লিখি ততবার ঢেউ তা মুছে দেয় আর যতবার ঢেউ মুছে দেয় তত বার আবার নাম লিখি। যেন আমাদের মাঝে ঘোর ঝগড়া চলছে। কেউ কাউকে ছাড়তে নারাজ। অবশেষে সমুদ্রের ঢেউয়ের কাছে হার মেনে আমি আর নাদিব পানিতে নেমে পড়লাম স্নান করতে। এখানে স্নান করার মজাই ছিল আলাদা। তাছাড়া বড় কোন ঢেউ এলে তার উপর লাফ দিয়ে ছবি তোলার অভিজ্ঞটাও খারাপ ছিল না। হঠাৎ লাবিব ভাইয়া ভাইয়া বলে ডাক দেয়। গিয়ে দেখি একটা জেলিফিশ। আসলে এখানে কিছুক্ষণ পরপর ঢেউ এর ধাক্কায় জেলিফিস নামক এই অসাধারণ মাছটি নজর কাড়ে উপস্থিত পর্যটকদের। প্রমাণ হিসেবে এর কয়েকটি ছবি তুলে রাখলাম।
আর এসময় দেখা হয় আমাদের ক্লাসমেট ঐতিহ্যের সাথে। ওর বাবা মার সাথে এসেছে। লকডাউনের কারণে বলতে গেলে ওর সাথে অনেকদিন পরেই দেখা হলো। আমরা তিনজন গল্প করছিলাম এমন সময় দেখি একটা কালো ইংরেজ ক্যাপ মাথায়; ঘোড়ার পিঠে ধীরগতিতে চলছে সুহৃদ। ওর ভাবসাব দেখে ভেবেছিলাম ও আবার ইংরেজ সৈন্য-টৈন্য হয়ে গেল না তো? কিছুক্ষণ এটা নিয়ে হাসাহাসি করি। হটাৎ করেই আমাদের আরেক বন্ধুর সাথে দেখা হল। ক্লাসের ফাস্ট ও। সুহৃদ আমাদের মতো ওর পরিবারের সাথে এসেছে।
আর এসময় দেখা হয় আমাদের ক্লাসমেট ঐতিহ্যের সাথে। ওর বাবা মার সাথে এসেছে। লকডাউনের কারণে বলতে গেলে ওর সাথে অনেকদিন পরেই দেখা হলো। আমরা তিনজন গল্প করছিলাম এমন সময় দেখি একটা কালো ইংরেজ ক্যাপ মাথায়; ঘোড়ার পিঠে ধীরগতিতে চলছে সুহৃদ। ওর ভাবসাব দেখে ভেবেছিলাম ও আবার ইংরেজ সৈন্য-টৈন্য হয়ে গেল না তো? কিছুক্ষণ এটা নিয়ে হাসাহাসি করি। হটাৎ করেই আমাদের আরেক বন্ধুর সাথে দেখা হল। ক্লাসের ফাস্ট ও। সুহৃদ আমাদের মতো ওর পরিবারের সাথে এসেছে।
আমরা তিন ভাইবোন (আমি,তায়েবা, লাবিব) একটা ঘোড়ার পিঠে করে পুরো তীরটায় একটা চক্কর দিলাম। ঘোড়া থেকে নামার পর ঐ ইংরেজ সৈন্য আর আমাদের নজরে পড়েনি। হঠাৎ এলো হঠাৎ হাওয়া হয়ে গেল; কি বিস্ময়কর!
আমরা বেশিক্ষণ আর এখানে টিকতে পারলাম না কারণ ছায়াহীন বিস্তৃত বালুময় এই সমুদ্র তীরে সূর্য ধীরে ধীরে তার রূপ বদলাচ্ছিল, ছড়াচ্ছিল তার প্রচন্ড কিরণ। দুপুরের দিকে তীর ছেড়ে উঠে আসি সমতল স্থানে। যেখানে একদিকে ছিল দোকানপাট, চরকা, ছোটদের খেলনা ঘোড়া ইত্যাদি। আর অন্যদিকে ছিল বিশাল কেওড়া বাগান।
কিছুক্ষণ পরই আমাদের খাওয়া-দাওয়ার আয়োজন শুরু হয়। বাড়ি থেকে বিরিয়ানি নিয়ে এসেছিলাম। খাওয়া-দাওয়া শেষ করে বনের দিকে হাঁটা শুরু করি। উল্লেখ্য এখানে কেউড়া গাছ ছাড়া অন্য কোন গাছ নজরে পড়ল না। আসলে নজরে পড়ার কথাও না; এই লবণাক্ত মাটিতে কেওড়া গাছ ছাড়া অন্য কোন গাছের পক্ষে টিকে থাকা ছিল অসম্ভব ব্যাপার। আর এই গাছে থোকা থোকা এক ধরনের ফল ধরে। চলার পথে বিঘ্ন হিসেবে ছিল কেওড়ার সূচালো শ্বাসমূল। যাইহোক অনেকক্ষণ ঘুরাঘুরি করার পর বন থেকে বেরিয়ে আসি। দুপুর তিনটে থেকে এখানে একটা ম্যাজিক শো হয়। আমরা সবাই টিকিট কেটে ভিতরে প্রবেশ করি। এখানে থেকে বেরিয়ে সবাই মিলে ছরকায় উঠি।
নিমতলিতে ঘুরে বেড়ানোটা শুধু সাময়িক একটা আনন্দ ছিল না। এটা অনেক কিছু শিখিয়েছে আমাকে; অনেক জানতে পেরেছি, অনেক অভিজ্ঞ তা লাভ করেছি। আমার জন্মভূমি হাতিয়ার প্রতি আমার শ্রদ্ধা আরও বেড়ে গেছে। জাহাজমারায় অবস্থিত এই অপরূপ স্থানটিতে ঘুরে বেড়ানোর দিনটি আমি আজও ভুলতে পারিনি। তাই স্মৃতির পাতায় খোদাই করে রাখলাম সেই অসাধারণ মুহূর্তগুলো।








Comments
Post a Comment